Thursday, December 9, 2021

‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্মই আসল ভরসা


বাংলাদেশের কিশোর-তরুণদের একটি বড় অংশের পরিচিতি দাঁড়িয়েছে ‘আই হেইট পলিটিকস’ জেনারেশন বা প্রজন্ম নামে। আমরা বড়রাই তাদের এই পরিচিতি দিচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত ফেসবুকে, নিজেদের সম্পর্কে কয়েক বাক্যে কিছু বলার সুযোগ থাকে। অনেকে কবিতাংশ জুড়ে দেন। আমরা বুঝে নিই তাদের কাব্যপ্রীতি আছে। কেউ কেউ দার্শনিকের উক্তি উদ্ধৃত করেন। টের পাই, তাঁরা দর্শন ভালোবাসেন। আবেগপ্রবণেরা প্রকাশ করেন আবেগ। রাজনীতিক জানান দেন তাঁর তরিকা, মত-পথ। তাতে কাছাকাছি ভাবনার মানুষ খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। তরুণ-তরুণীদের একাংশ ‘আই হেইট পলিটিকস’ লেখে। দেখে হয় রাজনীতির মানুষেরা তাঁদের এড়িয়ে চলেন অথবা তাঁরাই চান রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেন তাঁদের সঙ্গে সংযুক্ত না হন। এটি দেশের জন্য কুলক্ষণ ভেবে অনেকে তাঁদের সমালোচনা করেন। পুরোনো দিনের, মধ্যবয়সী ও পড়তি বয়সী রাজনীতিসংশ্লিষ্ট মানুষেরাই বেশি অভিযোগ করেন।

এখনকার তরুণেরা কেন মুখচোরা প্রজন্ম; কেন নির্বিকার-নিস্পৃহ, স্বদেশ প্রসঙ্গে কেন আগ্রহ কম ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ তুলে বড়রা আক্ষেপ করি। মাঝেমধ্যে সবক-নসিহতও দিই। রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা ফেসবুকে ‘আই হেইট পলিটিকস’ খুদে পরিচিতি লেখা কিশোর-তরুণদের নিয়ে বেশ হাস্যরস করেন, ট্রল করেন। ‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা পলায়নবাদী; সত্য ও বাস্তবতা পাশ কাটিয়ে চলে অথবা স্বার্থপর; নতুবা ভিতু-কাপুরুষ ধরনের। চ্যালেঞ্জ নিতে পারার মতো সৎ সাহস ও মনোবল তাদের নেই। এসব বলে অনেকেই হাহুতাশ করেন। শহুরে নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-যুবাদের ‘ফার্মের মুরগি’ নামের একটি স্থূল উপমা দিয়ে চেনানোর বদভ্যাসেও বড়দের অনেকেই আক্রান্ত।

রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের এভাবে সরিয়ে রাখার অথবা নিজেরা সরে থাকার কিশোর-কিশোরী মনস্তত্ত্ব কী? ‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্মের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগই-বা কতটা সত্য, কতটা ন্যায্য? তারা যদি তেমনই হবে, ২০১৮-এর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমরা কাদের দেখলাম? সাম্প্রতিক সড়ক-নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে যে একদল অসমসাহসী লড়াকু কিশোর-কিশোরী নিজেদের ন্যায্য কথাগুলো বলতে সামান্যও ভয় পাচ্ছিল না, তারা কারা? একটি বালিকাকে দেখলাম পুলিশকে বলছে, ‘আমি এই দেশের নাগরিক। এখানে দাঁড়ানো আমার অধিকার। আমার সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারা আমার অধিকার।’ তার কাছে আইডি কার্ড চাইলে সে স্কুল ইউনিফর্ম দেখিয়ে জানিয়েছিল, এটিই তার আইডি কার্ড। এই তাৎক্ষণিক আত্মবিশ্বাসী উত্তরের যে ওজন, বড়দের অনেকেই সে ওজনের একটি তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে হিমশিম খাবেন।

অনেক ফাঁপা নিয়মবাদী আছেন, নিয়মের প্যাঁচ তুলে হয়তো বলবেন, ছাত্র-পরিচিতি দেখাতে পারাই নিয়ম, তারা কেন দেখাবে না? কারণ, এখনো দেশের সিংহভাগ সাধারণ স্কুল পরিচিতি কার্ড দেওয়ার নিয়মটিই তৈরি করতে পারেনি। আইডি নেই, তাই বলে অধিকারের কথা বলা যাবে না? নিরাপদ সড়কের দাবি তোলা যাবে না? প্রাণের সুরক্ষার ন্যায্য চাওয়াটাই চাইতে পারা যাবে না? অনিয়মটি রয়ে গেছে বলেই তো তারা নিয়ম ফেরানোর দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। ২০১৮-এ তারা নিয়ম ফেরাতে রাস্তায় ট্রাফিকের দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের ‘তোমরা ট্রাফিক নও, নিয়ম ভাঙছ, আইন ভাঙছ’ বলা হতো নিরেট মূর্খতা। দাবির রূপকাত্মক ভাষা এ রকমই। দেখিয়ে দেওয়ার ভাষা। বোধ-সম্বোধ ফিরিয়ে আনার ভাষা। কিশোরেরাও জানত তারা ট্রাফিক নয়। তারা দেখিয়ে দিতে চেয়েছিল—‘দ্যাখো, সড়কে নিয়ম ফেরানো সম্ভব।’ এবং সেটি দেখিয়েও দিতে পেরেছিল। সে সময় এক কিশোরের রূপকাত্মক বক্তব্য শুনেছিলাম, ‘আমরা “মেরামত” করছি, মোটেই কোনো কিছু ভাঙছি না। আমার ঘরের চুলা নষ্ট হলে, নতুন না কিনতে পারলে, মেরামত করাব না? দরজার তালা নষ্ট হয়ে গিয়ে ভেতরে আটকা পড়লে রিপেয়ার করাব না?’ এ রকম পরিণত ভাবনার কিশোর-কিশোরীদের কীভাবে ‘আই হেইট পলিটিকস’ বলার দায়ে দোষী করা সম্ভব?

রাজনীতির মানুষজন কি খারাপ? ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত ছাত্ররা কি খারাপ? ‘রাজনীতি’ শব্দের আশপাশে বিশেষণের ডালপালা লাগিয়ে তারা যদি লিখত ‘চলতি রাজনীতি’, বা ‘ক্ষমতার রাজনীতি’ বা ‘দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি’, হয়তো কথা উঠত না। কিন্তু ঢালাও ‘রাজনীতি’ লেখায় এই বিভ্রান্তি। আসলে তাদের লেখা ‘রাজনীতি’ শব্দের আশপাশে প্রচ্ছন্ন ও অদৃশ্য আছে সেই বিশেষণগুলোই।


বালিকাটির স্কুলড্রেস দেখিয়ে দেওয়ার রূপক গুরুত্বটিও সমান সীমাহীন। ‘আসাদের শার্ট’ কেন অনুপ্রেরণার উৎস? নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা কেন অমূল্য? নূর হোসেনকে কি বলা যেত, ‘ব্যানারে-ফেস্টুনে লেখাই নিয়ম। বুকে-পিঠে লিখে তুমি অনিয়ম করেছ’? কয়েক দিন আগে বালক-বালিকারা ‘লাল কার্ড’ দেখাতে রাস্তায় নামল। অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত রূপকাত্মক কর্মসূচি। ‘তোমরা আগাগোড়া ফাউল করে চলেছ, তোমাদের লাল কার্ডই প্রাপ্য’—এ রকম পরিণত চিন্তার বালক-বালিকাদের ঢালাওভাবে ‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্ম বলা বা ভাবার গলদটি আসলে কোথায়, দেখা যাক।

কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি গবেষণাকাজ করছি। সে জন্য সম্প্রতি যখন যেখানে যাচ্ছি, কিশোর-কিশোরী পেলেই কথা বলছি। গবেষণার ছকের বাইরে গিয়েই তাদের জানছি। জেনে নিশ্চিত হয়েই বলছি, বর্তমানের কিশোর-কিশোরীদের দেখার চোখ বড়দের চেয়ে অনেক স্বচ্ছ, অনেক বেশি সুগভীর। বড়দের ভীতি, আতঙ্ক, আপসকামিতা, স্খলন—কোনো কিছুই তাদের নজর এড়াচ্ছে না। কৈশোরের ভাব-ভাবনার মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, তারাও বড়দের অবিমৃশ্যকারিতা ও কাপুরুষতা দেখে সমান চিন্তিত। 

কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা নতুন বন্ধু পেতে বেশি পছন্দ করে। তাই অল্প বাক্যে নিজেদের প্রকাশ করার বেলায় অনেক ভেবেচিন্তেই খুদে পরিচিতিটি লেখে। তারা ভালোই বোঝে ও জানে যে ফেসবুকের খুদে পরিচিতিগুলোই তাদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। খুদে পরিচিতিগুলো লেখা ও বেছে পোস্ট করার বেলায় তারা বেশ সময়ও দেয়। তাই তাদের একটা বড় অংশ যখন লেখে ‘আই হেইট পলিটিকস’, তাকে ‘ভাব ধরা’ ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং মানতে হবে যে তারা আসলে অন্যদের মধ্যে একটি বিশেষ ভাব বা ভাবনা নির্মাণ করার সহজ চেষ্টাটি করছে। ভাবটি এ রকম, ‘দেখো, আমি একজন ভালো ছেলে বা মেয়ে। আমাকে বন্ধু করে নিলে তোমাকে পস্তাতে হবে না।’ গুপ্ত ভাবটি এ রকম, ‘রাজনীতি করা ছেলেমেয়েদের মতো আমরা খারাপ নই।’

রাজনীতির মানুষজন কি খারাপ? ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত ছাত্ররা কি খারাপ? ‘রাজনীতি’ শব্দের আশপাশে বিশেষণের ডালপালা লাগিয়ে তারা যদি লিখত ‘চলতি রাজনীতি’, বা ‘ক্ষমতার রাজনীতি’ বা ‘দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি’, হয়তো কথা উঠত না। কিন্তু ঢালাও ‘রাজনীতি’ লেখায় এই বিভ্রান্তি। আসলে তাদের লেখা ‘রাজনীতি’ শব্দের আশপাশে প্রচ্ছন্ন ও অদৃশ্য আছে সেই বিশেষণগুলোই।

আগেই লিখেছি, পুরোনো দিনের, মধ্যবয়সী ও পড়তি বয়সী রাজনীতিসংশ্লিষ্ট মানুষেরাই ‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্মের সমালোচনায় বেশি মুখর। কারণ, তাঁদের কৈশোরকালে তাঁরা রাজনীতিকদের দেখেছিলেন অনুপ্রেরণার আকর হিসেবে। বায়ান্ন না দেখলেও উনসত্তর-একাত্তর চাক্ষুষ করেছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন দেখেছেন। তখনো রাজনীতিকদের সবাই ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন না। কিছু কিছু পচা আপেল তখনো ছিল। তবু তাদের ওপর ভরসাই নয়, নির্ভর করারও সুযোগ ছিল। পরিবর্তন আসত তাদের হাত ধরেই। কিশোর-তরুণেরা পত্রপত্রিকা পাঠের সুযোগ পেত কম। ইন্টারনেট-গুগল-ফেসবুক ছিল না। বড়রা আলোচনা করতেন। তাদের পছন্দ-অপছন্দ অনুমোদনমাফিক তারাও নেতা-নেত্রী এবং রাজনীতি বুঝে নিত। রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ–অশ্রদ্ধাবোধও সেভাবেই তৈরি করে নিত।

এখন তো রাজনীতিমনস্ক হওয়া আরও সহজ। ইন্টারনেট সূত্রে সারা দুনিয়াই নতুন প্রজন্মের হাতের মুঠোয়। সব খবরাখবরই প্রজন্মের জানা। এড়িয়ে যাওয়ারই-বা সুযোগ কোথায়? তবু প্রজন্ম ‘আই হেইট পলিটিকস’ লেখে কেন? উত্তর পেতে প্রশ্ন—এই প্রজন্মের জন্য চলতি সময়ের রাজনীতিকদের মধ্যে একজনও অনুকরণীয়-অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব কি আছেন? একের পর এক দেশের ও রাজনীতির দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা শীর্ষ রাজনীতিকদের ধর্ষক, দাগি অপরাধী ও দুর্বৃত্ত হিসেবে চিনতে বাধ্য হওয়া কিশোর-তরুণেরা ‘আই হেইট পলিটিকস’ লিখবে না তো কী লিখবে? তাদের ‘আই হেইট পলিটিকস’ মোটেই রাজনীতি বিযুক্তি নয়, বরং দুর্বৃত্তায়িত চলতি রাজনীতির প্রতি ঘৃণাভরা অননুমোদন। যখন ‘মেরামত’-এর প্রয়োজন পড়ে, তখন ঠিকই তারা মেরামতে নামে। শুদ্ধ রাজনীতির হাতেখড়ি দেওয়া গেলে মন্দকে ঘৃণা করতে শেখা স্বশিক্ষিত এই ‘আই হেইট পলিটিকস’ প্রজন্মই ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের আসল কান্ডারি হয়ে উঠবে।

হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ



শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: